শুটকি
শুটকি

নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উৎপাদন। কেন শুটকি খাবেন বা কেন শুটকি খাওয়া উচিত?

শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণ একটি অতি প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। শুঁটকিকরণ একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সূর্যালোক এবং বাতাসের মাধ্যমে মাছ থেকে পানি বা জলীয় অংশ অপসারণ বা হ্রাস করে মাছকে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। মাছের দেহে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ পানি থাকে। সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের জন্য শুঁটকিতে পানির পরিমাণ খুব দ্রুত ১৬-১৮ শতাংশে কমিয়ে আনতে হয়। শুঁটকিকরণের ফলে মাছের দেহের পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীবসমূহ জন্মাতে বা বৃদ্ধি পেতে পারে না। ফলে শুঁটকিতে আর পচন ঘটে না। তবে সব ধরনের মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায় না। যেমন ইলিশ মাছসহ যেসব মাছে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে, সেসব মাছ এ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায় না।
আমাদের দেশে শুঁটকি মাছ একটি জনপ্রিয় খাদ্য উপাদান। শুঁটকি মাছের কাক্সিক্ষত স্বাদ ও গন্ধ ছাড়াও এটি অত্যন্ত পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য। শুঁটকি মাছে সাধারণত ৬০-৮০ শতাংশ আমিষ এবং ৮-২০ শতাংশ তৈল বা চর্বি থাকে। শুঁটকি মাছের তেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী যেমন স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা হ্রাস করে, উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করে এবং শর্করা বিপাকে সাহায্য করে ইত্যাদি। শুঁটকি মাছ সহজে পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং সংরক্ষণ করা যায়। দেশে ও বিদেশে শুঁটকি মাছের পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে।

আমাদের দেশে সাধারণত সূর্যালোকে মাছ শুকানো হয়। ছোট মাছের বেলায় মাছ প্রথমে ভালো করে ধুয়ে লবণ পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে পরে পানি ঝরিয়ে বাঁশের চাটাই বা মাদুরের ওপর মাছগুলো বিছিয়ে সূর্যালোকে শুকানো হয়। কড়া রোদে দু-তিন দিনের মধ্যে শুঁটকি তৈরি হয়ে যায়। বড় মাছের বেলায় নাড়িভুঁড়ি, পাখনা ও আঁইশ ফেলে দিয়ে ভালো করে ধোয়া হয়। ধারালো ছুরি দিয়ে লম্বালম্বিভাবে মাছগুলোকে চিরে দেওয়া হয়। এরপর লবণ পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে পরে পানি ঝরিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাঁশের র‌্যাক তৈরি করে মাছগুলোকে ঝুলিয়ে শুকানো হয়। শুকনো মাছ পলিথিনের ব্যাগে সংরক্ষণ করা হয়।
সূর্যালোকে শুকানো মাছের গুণাগুণ অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু মাছকে খোলা আকাশের নিচে শুকানো হয়, তাই বিভিন্ন ধরনের মাছি ও পোকামাকড় শুঁটকিতে ডিম পাড়ে, যা পরবর্তীতে গুদামজাত করার সময় পূর্ণাঙ্গ পোকায় পরিণত হয় এবং শুঁটকির ক্ষতি করে। পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য শুঁটকিতে নানা প্রকার ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও উন্মুক্ত স্থানে অতিরিক্ত সূর্যালোকে শুঁটকিকরণের ফলে মাছের দেহে উচ্চমাত্রায় চর্বির জারণ (lipid oxidation) ঘটে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কটু গন্ধের সৃষ্টি হয়। এসব কীটনাশক মিশ্রিত অথবা চর্বির জারণকৃত শুঁটকি মাছ খেলে মানুষের দেহে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব যেমনÑ অকাল বার্ধক্য, হৃদরোগ, ক্যানসার এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এসব কারণে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত শুঁটকি মাছের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়।

  • নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উৎপাদনে করণীয় বিষয়সমূহ
  • শুঁটকি তৈরির সময় অবশ্যই তাজা মাছ ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বাসি বা পচা মাছ ব্যবহার করা উচিত নয়।
  •  মাছের নাড়িভুঁড়ি, আঁইশ, পাখনা ইত্যাদি ফেলে দিয়ে পরিষ্কার পানি দ্বারা ধুয়ে নিতে হবে।
  • শুঁটকি তৈরির সময় সর্বদা স্বাস্থ্যসম্মত বিধি অনুসরণ করা উচিত। ব্যবহার্য সব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে ও পরে ভালোভাবে পরিষ্কার করা উচিত। এতে ক্লোরিন পানি ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • মাছ শুকানোর আগে লবণ দ্রবণে চুবিয়ে নিলে মাছে মাছি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়।
  • মরিচ ও হলুদের পোকামাকড় প্রতিরোধী গুণ রয়েছে বিধায় ০.৩ শতাংশ মরিচ ও ০.১ শতাংশ হলুদের গুঁড়া একসাথে মাছে মাখিয়ে দিয়ে শুকাতে হবে। মরিচ ও হলুদমাখা শুঁটকি উৎপাদনের পর সহজে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
  • শুঁটকি করার সময় মাছকে মাছি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করার  জন্য স্বচ্ছ পলিথিন বা জাল দিয়ে ঢেকে শুকানো উচিত।
  • শুঁটকি মাছ সঠিকভাবে শুকানো উচিত, যাতে পানির পরিমাণ ১৫-২০ শতাংশের বেশি না থাকে। পানির পরিমাণ এর চেয়ে বেশি হলে শুঁটকির গুণগতমান দ্রুত নষ্ট হয়।
  • মাছ শুকানোর সময় পোকামাকড়ের দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ রোধ করার জন্য সোলার টেন্ট ড্রায়ার ব্যবহার করা উচিত। এটি শুকানোর মাত্রাকেও ত্বরান্বিত করে।
  • গুদামজাতকালে শুঁটকির জারণক্রিয়া রোধ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের এন্টি-অক্সিডেন্ট যেমনÑ ভিটামিন-ই, ইঐঞ (Butylated hydroxy toluene), BHA (Butylated hydroxy anisol) ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • উন্মুক্ত স্থানে শুঁটকি মজুত বা গুদামজাত করা উচিত নয়। বায়ু নিরোধক পাত্রে শুঁটকি গুদামজাত করা উচিত। এ ছাড়া বায়ু নিরোধক পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণ একটি সহজলভ্য পদ্ধতি। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ শুকানোর ফলে উৎপাদিত শুঁটকি মাছের গুণগতমান অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*