বালাচাও
বালাচাও

রেসিপি লইট্টা শুটকি ও আলু

শুঁটকী মাছ রান্না নিয়ে আজ কয়েকদিন ব্লগে বেশ কথা চলছে। আমার রান্নাতো সিলেটী বোন সুরঞ্জনা আপা বেশ কয়েকটা কমেন্টে শুঁটকী মাছের কথা বলেছেন। এদিকে ছোট বোন রাশিদা আফরোজও একটা মেইলে লিখেছেন, ভাইয়া ক্যাটাগরি আলাদা করে দেন। মাছ আর শুঁটকী আসলেই ক্যাটাগরি আলাদা করা উচিত। শুঁটকী যদিও মাছের আওতায় পড়ে তবুও শুঁটকীর জন্য আলাদা ক্যাটাগরি হলে ভাল, খুঁজে পেতে সহজ হয়। আমার বোনেরা শুঁটকী মাছের কথা বলে আমার জিবে জল এনে দিয়েছেন। এদিকে আমি ও আমার ব্যাটারীও অনেকদিন শুঁটকী (প্রায় ৬ মাস তো হবেই) রান্না করি নাই। গতকাল রান্নাঘরে আমাদের শুঁটকী রান্না নিয়ে কথা চলছিলো।

বাংলাদেশের সবাই আমরা শুঁটকী পছন্দ করি না। শুঁটকী রান্না টেবিলে দেখলে অনেকে আমরা নাকে রুমাল দিয়ে ফেলি। কিন্তু ভাল করে শুঁটকী রান্না করলে আমি নিশ্চিত আপনি চারটা ভাত বেশী খাবেন এবং পারলে হাতও খেয়ে ফেলতে পারেন! আমার মায়ের হাতের যে কোন শুঁটকী মাছ (গোটা রসুন দিয়ে) রান্না পেলে আমি নিশ্চিত মুর্দাও উঠে দাঁড়িয়ে যাবে, বলবে ‘আমি খাব’! হা হা হা…… চাপাটা বেশী মারি নাই কিন্তু। সত্যই আমার আম্মা শুঁটকী মাছের রান্না বেশ ভাল করেন কিন্তু মজার ব্যাপার বললে আপনারা হেসে ফেলবেন, তিনি নিজে শুঁটকী খান না! আমাদের জন্য রান্না করতেন।

কতদিন মায়ের হাতের রান্না খাই নাই। অবশ্য এখন আর মায়ের হাতের রান্না খেতে চাই না, এখন আমি তাকে রান্না করে খাওয়াতে চাই এবং এটা চাই তিনি আমার হাতের রান্না খেয়ে বলবেন, বেশ ভাল রান্না শিখেছিস দেখছি! আমিও তার সামনে হেসে পড়তে চাই! হা হা হা…। মা, দোয়া করো যাতে জীবনের বাকীদিন গুলো তোমার বৌ মার সাথে রান্নাঘরে টিকে যেতে পারি!

আমার আম্মা আমার এই রেসিপি সাইটের কথা জানেন। তিনি ইতালীতে তার মেয়ের সাথে, নাতীর সাথে আমার এই সাইট দেখেন। রান্না বান্নার কথা উঠলে, আমাকে নিয়ে আশ্চর্য্যবোধ করেন! আমার মত ছেলে রান্না শিখে যাবে এটা তিনি অবশ্য এখনো মনে প্রানে বিশ্বাস করেন না! কিন্তু এটাই বাস্তব ‘মা’! আমি রান্না শিখে গেছি (অবশ্য এর কৃতিত্ব আমার স্ত্রী তথা ব্যাটারীর)। আমি এখন নিজেই রান্না করতে পারি, এখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আই ক্যান।

দেশের শত শত ছেলে যেদিন আমার মত বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, তারা রান্না জানে, সেদিন আসলেই আমি আরো খুশি হব। খাবার যেহেতু সম্পূর্ন নিজের ব্যাপার, তা হলে আপনি কেন রান্না করবেন না। নিজের খাবার কেন আপনি নিজে রান্না করবেন না। আমি এখন বুঝে গেছি, আমার বিবেকবোধ খুলে গেছে, রান্না শুধু মা, বোন, স্ত্রী বা মেয়ের কাজ নয়। আমি এটাও বুঝে গেছি, মা, বোন, স্ত্রী বা মেয়েরা মহৎ এবং ভদ্র বলে আমাদের রান্না করে দেন। তারা যদি বলে রান্না করবেন না, আমাদের কিছুই করার নাই। আমাদের ছেলেদের/পুরুষদের বুঝতে হবে, আমরা তাদের উপর সামাজিক এই বোঝাটা চাপিয়ে দিয়েছি, যা অন্যায়। মা, বোন, স্ত্রী বা মেয়ের প্রতি আমাদের সন্মান আরো আরো বাড়ানো উচিত।

যাই হোক, আজ অনেক কথাই বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। দেশে নারীদের প্রতি যে হারে সহিংসতা বেড়ে চলছে, তাতে আমি দুঃখ প্রকাশ করি, একজন পুরুষ হিসাবে প্রতিনিয়ত লজ্জা পাই। সেইম… যারা নারীদের অত্যাচার করে থাকে তাদের প্রতি নিয়ত চালে পাথর বাছা, পেঁয়াজ কাটা, শাক শব্জি বাছা কাটা, মাছ মুরগী ছিলানো যেতে পারে। তা হলে বুঝবে কত ধানে কত চাল! প্রতিদিন একজন মা কি পরিমান কষ্ট করেন তা বুঝতে হলে এর বিকল্প নাই।

আজ অনেক কথা হল, চলুন লইট্ট্যা শুঁটকী ও আলু রান্না দেখি। পরিমান সামান্য, মাত্র দুইজনের জন্য এক বেলায় খাবারের রান্না হয়েছে।

উপকরনঃ
– লুইট্ট্যা শুঁটকীঃ ২০০ গ্রাম (টুকরা ছোট বা আপনার ইচ্ছা মত করে নিতে পারেন)
– আলুঃ ২০০ গ্রাম (পাল্লা পাথর নিয়ে বসার দরকার নেই)
– পেঁয়াজ কুঁচিঃ হাফ কাপ
– আদা বাটাঃ ১ চা  চামচ
– রসুন বাটাঃ ১ টেবিল চামচ
– হলুদ গুড়া বা বাটাঃ ১ চা চামচের কম
– মরিচ গুড়া বা বাটাঃ ১ চা চামচ (বুঝে শুনে, ঝাল পরিমিত হওয়া জরুরী)
– কাঁচা মরিচঃ ৫/৬ টা (ঝাল বুঝে)
– ধনিয়া পাতাঃ পরিমান মত
– লবনঃ পরিমান মত
– তেলঃ সয়াবিন তেল হাফ কাপের চেয়ে কম (শুঁটকীতে একটু তেল বেশি হলে ভাল হয়)
– পানিঃ পরিমান মত

প্রনালীঃ

তেল গরম করে লবন যোগে পেঁয়াজ কুঁচি ভাজুন এবং আদা, রসুন দিয়ে আবারো ভাজুন। কাঁচা মরিচ ছিরে দিয়ে দিন।

ভাজা হয়ে গেলে তাতে আলু ও শুঁটকী দিয়ে দিন। (শুঁটকী গরম পানিতে ধুয়ে নিতে ভুলবেন না)

ভাল করে খুন্তি দিয়ে মিশিয়ে নিন এবং মিনিট পাঁচেক ভাজুন।

এবার মরিচ ও হলুদ দিন এবং মিশিয়ে নিন।

মিশানো হয়ে গেলে দেড়/দুই কাপ (পরিমান মত) গরম পানি দিন।

যস মিনিট ২০শেকের জন্য ঢাকনা দিয়ে ঢেকে আগুনের আঁচ দিন। মাঝে মাঝে এসে খুন্তি দিয়ে নাড়িয়ে যাবেন। চুলা থেকে সরে না যাওয়া ভাল। পানি শুকিয়ে কড়াইয়ের তলায় লেগে যেতে পারে। সুতারাং কাছে থাকুন। আবার নাড়াতে গিয়ে শুঁটকী ভেঙ্গে ফেলবেন না! হা হা হা…

ঝোল শুকিয়ে এমন একটা অবস্থায় এসে যাবে। ফাঁকে ফাইন্যাল লবন দেখুন।

ব্যস পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত।

আপনিই বলুন, কেমন লাগছে? খাবেন কি খাবেন না!

সবাইকে শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.